মাল্টিমিডিয়া কি কিভাবে কাজ করে এবং মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির ব্যবহার

আদিকাল থেকেই মানুষ নিজেকে প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম বা মিডিয়া ব্যবহার করেছে। লেখা একটি চিত্রও একটি প্রকাশ মাধ্যম। আমরা যখন অনেকগুলাে প্রকাশ নিয়ে কথা বলি তখনই মাল্টিমিডিয়া বলে তাকে চিহ্নিত করে থাকি। সভ্যতার বিবর্তন উক্ত চিহ্নিত করে থাকি। সভ্যতার বিবর্তন ও প্রযুক্তির এই মাধ্যমগুলাের বহুবিধ ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশেষ করে আমরা যখন ডিজিটাল যুগে এ আমাদের প্রকাশ মাধ্যমের ধরন বদলে গেছে।

মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির সংক্ষিপ্ত ধারণা

এখন অনুভব করি যে, এনালগ যুগের মিডিয়াগুলাে লগ যুগের পুরানাে মিডিয়া এ যুগে ব্যবহৃত হলেও যুগে ব্যবহৃত হলেও এর ব্যবহারের মাত্রা বদলেছে। এক সময়ে যেসব Multimedia ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হতাে তা এখন একসাথে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার সেই সব মাল্টিমিডিয়া এর অধীনে ডিজিটাল যন্ত্রের প্রােগ্রামিং করার ক্ষমতা। আমরা এখন বহু মিডিয়াকে তার বহুমাত্রিকতা ও প্রোগ্রামিং ক্ষমতার জন্য বলছি ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া। এই দুটি শব্দ এখন ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এক কথায় মাল্টিমিডিয়া মানে বহু মাধ্যম। ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া মানে হচ্ছে, সেই বহু মাধ্যম যার সাথে ব্যবহারকারী যােগাযােগ করতে পারে।

 

মাল্টিমিডিয়া হলাে মানুষের বিভিন্ন প্রকাশ মাধ্যমের সমন্বয়। আমরা অন্তত তিনটি মাধ্যম বা মিডিয়া ব্যবহার করে নিজেদেরকে প্রকাশ করি সেগুলাে হলাে বর্ণ, চিত্র এবং শব্দ (সাউন্ড)। এই মাধ্যমগুলাের বিভিন্ন রূপও রয়েছে। এই তিনটি মাধ্যম তাদের বিভিন্ন রূপ নিয়ে কখনাে আলাদাভাবে, কখনাে একসাথে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়। এসব মাধ্যমের প্রকাশকে আমরা কাগজের প্রকাশনা, রেডিও, টেলিভিশন, ভিডিও, সিনেমা, ভিডিও গেমস, শিক্ষামূলক সফটওয়্যার, ওয়েবপেজ ইত্যাদি নানা নামে চিনি। তবে এর সবগুলােকেই বা একাধিক মাধ্যমকেই

 

আমরা আলাদাভাবে মাল্টিমিডিয়া বলব না। কাগজের প্রকাশনা বা রেডিওকে কেউ মাল্টিমিডিয়া বলতে চাইবেন না। বলা ঠিক হবে না। টেলিভিশন-ভিডিও-সিনেমাকে আমরা মাল্টিমিডিয়া বলতে পারি। আবার ভিডিও গেমস, শিক্ষামূলক সফটওয়্যার বা ওয়েব পেজকে আমরা ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া বলতে পারি। মাল্টিমিডিয়া সচরাচর ডিজিটাল যন্ত্রের সহায়তায় ধারণ বা পরিচালনা করা যায়। এটি সরাসরি মঞ্চে প্রদর্শিত হতে পারে বা অন্যরপে সরাসরি সম্প্রচারিতও হতে পারে। মাল্টিমিডিয়া বিষয়বস্তু ধারণ ও পরিচালনা করার ইলেকট্রনিক যন্ত্রকেও মাল্টিমিডিয়া নামে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। কোনাে একটি কর্মকাণ্ডে তিনটি মাধ্যমকেই একসাথে ব্যবহার করাকে মাল্টিমিডিয়া বলে।

মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির উৎপত্তি

উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে ১৮৯৫ সালে সিনেমা হবার পর তাতে বর্ণ (Text), চিত্র (Graphics), শব্দ (Sound) এবং চলমানতা Animation) যুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন মাধ্যমের পরপর সংলগ্ন হবার ব্যাপারটি ঘটতে থাকে যা মাল্টিমিডিয়ার রূপ। আজকের দিনের মাল্টিমিডিয়ার পূর্বপুরুষ বলতে তাই সিনেমাকে স্মরণ করতে হবে। তবে প্রযুক্তিগতভাবে বিভিন্ন মাধ্যমের যুক্ত হবার সেই সূচনাকালটি অনেক আগের হলেও এসবের সাথে কম্পিউটরের যুক্ত হওয়া খুব বেশি দিনের ব্যাপার নয়।

 

মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমসমূহ

 

প্রকাশ করার যন্ত্র আমরা সবাই জানি সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিজিটাল যন্ত্র কম্পিউটার গণনা যন্ত্র বা হিসাব-নিকাশ । হিসেবেই সমধিক পরিচিত হয়ে আসছে। তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও যােগাযােগ কম্পিউটারের আরাে একটি লেখা কাজ ছিল। এরপর লেখালেখি করার জন্য এই যন্ত্রটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়।

 

কিন্তু এতসব কাজ করার জন্য শুরুতে কম্পিউটারের একটি মাত্র মিডিয়া যথা- বর্ণ ব্যবহার করতে হতাে। কিন্তু কালকমে কম্পিউটারে চিত্র এবং শব্দ সমন্বিত হয়। তাছাড়া কম্পিউটারের রয়েছে প্রােগ্রামিং করার ক্ষমতা।বস্তুত কম্পিউটারের মাল্টিমিডিয়া মানে হলাে বর্ণ, চিত্র ও শব্দের সমন্বয়ে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ আভজ্ঞতা। অতীতের চাইতে এখনকার মাল্টিমিডিয়ার অভিজ্ঞতা অনেক সমৃদ্ধ। যন্ত্র হিসেবেও মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার কেবল কম্পিউটারেই সীমাবদ্ধ নয় পাশাপাশি আমাদের হাতের কাছের মােবাইল ফোন, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্র এখন মাল্টিমিডিয়া ধারণ ও পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয় ।

মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি

মাল্টিমিডিয়ার প্রধান মাধ্যমসমূহ নিচে বর্ণনা করা হলাে

 

সারা পৃথিবীতে এখন সর্বপ্রথম যে প্রবণতাটি স্পর্শ করছে সেটি হচ্ছে প্রচলিত ধারণা ও প্রচলিত যন্ত্রপাতিকে কম্পিউটার দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করা ।

 

১. বর্ণ বা টেক্সট: সারা দুনিয়াতেই টেক্সটের যাবতীয় কাজ এখন কম্পিউটারে হয়ে থাকে। একসময় টাইপ রাইটার দিয়ে এসব কাজ করা হতাে, এখন অফিস-আদালত থেকে পেশাদারি মদণ পর্যন্ত সর্বত্রই কম্পিউটার ব্যবহার হচ্ছে।

 

২. চিত্র বা গ্রাফিক্স: দুনিয়ার সর্বত্রই গ্রাফিক্স তৈরি, সম্পাদনা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ কম্পিউটার ব্যবহার করেই করা হয়। আমাদের দেশে গ্রাফিক্স ডিজাইন, পেইন্টিং, ড্রইং বা কমার্শিয়াল গ্রাফিক্স নামক চারুকলার যে অংশটি রয়েছে তাতে কম্পিউটারের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। তবে একটি ব্যক্তি এলাকা হচ্ছে মুদ্রণ ও প্রকাশনা। মুদ্রণ প্রকাশনায় গ্রাফিক্স ডিজাইনের ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যবহার এ হয় নব্বই দশকে। প্রথমে ফটোশপ দিয়ে স্ক্যান করা ছবি সম্পাদনা দিয়ে এর সূচনা হয়। এ ডিজাইন এবং গ্রাফিক্সে কম্পিউটার জায়গা করে নিতে থাকে ।

 

চিত্র বা গ্রাফিক্স কে আবার ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে

 

ভিডিও: ভিডিও কার্যত এক ধরনের গ্রাফিক্স। একে চলমান গ্রাফিক্স বললে ভাল হয়। বিশ্বজুড়ে ভিডিও একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মিডিয়া। টিভি, হোম ভিডিও , মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার , ওয়েব ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই ভিডিওর ব্যাপক ব্যবহার।

এনিমেশন : এনিমেশন ও এক ধরনের গ্রাফিক্স বা চিত্র, তবে সেটি চলমান বা স্থির হতে পারে । আমাদের দেশে এনিমেশনের ব্যবহার ও ক্রমশ ব্যাপক হচ্ছে। বিশেষত বিজ্ঞাপনচিত্রে অ্যানিমেশন একটি প্রিয় বিষয়, তবে অ্যানিমেশনে কাজ করার লোকের অভাব রয়েছে। আসলে নমিনেশন কখনোই কেবল একক মিডিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। এর সাথে অডিও,ভিডিও,টেক্সট ,গ্রাফিক্স ইত্যাদি সম্পর্ক রয়েছে।

 

৩. শব্দ বা অডিও; শব্দ বা অডিও রেকর্ড, সম্পাদনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সারা দুনিয়া এখন কম্পিউটারের উপর নির্ভর করে। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ এনালগ পদ্ধতি এখন কার্যত সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। কম্পিউটার দিয়ে উন্নত মানের সাউন্ড রেকর্ডিং করতে পারেন ‌।

আরো পড়ুন» ৫টি জনপ্রিয় ওয়েব সাইট যা আপনার প্রয়োজনে আসতে পারে ।

মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির ব্যবহার

 

মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির উপকার বেশি দেখে দিন দিন এর ব্যবহার বেড়েই চলছে। বর্তমানে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহারের ক্ষেত্র সময় নানান দিক উন্মোচিত হয়েছে। তার তার মধ্যে কিছুটা এরূপ ব্যবহার মাল্টিমিডিয়ার।

 

শিক্ষার উপকরণ হিসেবে : শিক্ষার উপকরণ হিসেবে বর্তমানে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার ব্যাপক। শ্রেণিকক্ষগুলাে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার হলে শিক্ষার্থী সহজে বিষয়টি বুঝতে পারবে। শিক্ষক শিক্ষণীয় বিষয়টি মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে সহজে উপস্থাপন করতে পারেন। এছাড়া রয়েছে মাল্টিমিডিয়ার সফটওয়্যার।

 

মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার: বাংলাদেশে মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার প্রস্তুত হওয়া কেবল শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ-৭১, অবসর, বিশ্বকোষ, নামাজ শিক্ষা, বিজয় শিশু শিক্ষা- এমন কয়েকটি সিডিতে।অবশ্য আশা করা হচ্ছে একুশ শতকে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার তৈরি হবেই।

 

ডিজিটাল প্রকাশনা: আমাদের প্রকাশনা এখনাে কাগজ নির্ভর। তবে একুশ শতক অবশ্যই ডিজিটাল প্রকাশনার শতক হবে বাংলাদেশেও।

বিনােদন : বিনােদনের অধিকাংশ এলাকায় মাল্টিমিডিয়া জুড়ে রয়েছে সিনেমা বা নাটকের ক্ষেত্রে। মাল্টিমিডিয়ার সাহায্যে স্পেশাল ইফেক্ট ব্যবহার করে আরও প্রাণবন্ত করা হচ্ছে।

 

বিজ্ঞাপন : বিজ্ঞাপনে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের ফলে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তা উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। সম্ভব অসম্ভব অনেক কিছুই দেখানাে যাচ্ছে।

 

গেমস : কম্পিউটার গেমস বা ভিডিও গেমগুলােতে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার ব্যাপক গেমসগুলােতে।  মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের ফলে প্রকৃত অর্থে বাস্তবতা (Reality) ছোঁয়া পেতে শুরু করেছে।

 

এনিমেশন : এনিমেশন ও এক ধরনের গ্রাফিক্স বা চিত্র তবে সেটি চলমান বা স্থির হতে পারে এটি দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক হতে পারে । আমাদের দেশে এনিমেশন এর ব্যবহারও ক্রমশ ব্যাপক হচ্ছে বিশেষত বিজ্ঞাপনচিত্রে নামের একটি প্রিয় পদ্ধতি এবং আরো অনেক ক্ষেত্রে অ্যানিমেশনের ব্যবহার করা হয় যেমন বিনোদনের ক্ষেত্রে।

কারা মাল্টিমিডিয়া নিয়ে কাজ করেন

 

যিনি টেক্সট, গ্রাফিক্স, অডিও, ভিডিও, এনিমেশন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন তিনিই মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ডেভেলপার। এই কাজটি করার জন্য এডােবি ফটোশপ থেকে থ্রিডি স্টুডিও ম্যাক্স বা মায়া ইত্যাদি অনেক সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষিত বিবেচনা করে আমরা তাদেরকেই মাল্টিমিডিয়া প্রােগ্রামার অথবা মাল্টিমিডিয়া অথর বলবাে যারা এসব মিডিয়া ব্যবহার করে একটি ইন্টার অ্যাকটিভ অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করবেন।

 

বস্তুত কনটেন্টস ডেভেলপ করা ও ইন্টার অ্যাকটিভিটি যােগ করার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। এডােবি প্রিমিয়ার বা এডােবি ফটোশপ এমন সফটওয়্যার, যা দিয়ে একটি চমৎকার কনটেন্টস তৈরি করা যায়। কিন্তু আমরা মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার তৈরির প্রােগ্রাম বলবাে ডিরেক্টরকে, যার সাহায্যে প্রিমিয়ার বা ফটোশপে তৈরি করা মিডিয়াগুলােকে মিলিয়ে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা যায়।

 

এখানে ইন্টারঅ্যাকটিভিটি সম্পর্কে একটি কথা জানা আমাদের প্রত্যেকের প্রয়ােজন। মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে একটি স্টাইল প্রয়ােগ করলে যদি অক্ষরগুলাে সুন্দর করে স্ক্রল বা ফ্লাস করে বা যদি ভিডিও ফাইলে একটি ইফেক্ট যােগ করা হয় কিংবা এনিমেশন করলে যদি কিছু একটা পরিবর্তন হয় তাকে ইন্টারঅ্যাকটিভ বলা ঠিক হবে না। ফ্লাশ, ডিরেক্টর বা অথরওয়্যার-এর মতাে শক্তিশালী অথরিং সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি ব্যবহারকারীর সাথে কম্পিউটারের মিথস্ক্রিয়া সম্ভব এমন কিছুকেই আমরা ইন্টারঅ্যাকটিভিটি বলব।

 

আগামী দিনগুলােতে মাল্টিমিডিয়া প্রােগ্রামারের চাহিদা এবং সংখ্যা কোনােটাই কম হবে না। একটি বিষয় এখন সকলকেই বুঝতে হবে যে, বিজনেস সফটওয়্যার ও সার্ভিসেস-এর পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টস। ডেভেলপ করা ও প্রােগ্রামিং করতে পারা লােকের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ছে।

 

 

 

Leave a Comment